Tuesday, 24 May 2016

জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারসঃ প্রথম যুগ নিয়ে আরও কিছু কথা

জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারসের খেলা শুরু হয়েছিল ১৮০৬ সালে তা আগেই বলেছি। এই খেলা নিয়ে আগেই দুটি পোস্ট করেছি।এখন যা পরে থাকছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বহুল বিষয় যা একই সাথে চমকপ্রদও বটে।
    জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারসদের খেলার প্রথম যুগ অর্থাৎ ১৮০৬ সাল থেকে ১৮৬৪ সাল অবধি ছিল প্লেয়ারসদের দাপট।এই সময়ে জেন্টলম্যান দল খুব একটা ভাল খেলেনি।বহু ক্ষেত্রে প্লেয়ারসদের থেকে খেলোয়াড় নিয়ে দল পূর্ণ হত।একথাও ঠিক যে সমান সমান সংখ্যক খেলোয়াড় নিয়ে তারা মাত্র ৭টা ম্যাচ জেতে।
   প্রথম ম্যাচেই প্লেয়ারস বেলদ্যাম ও ল্যাম্বারট কে জেন্টলম্যান দলে নেওয়া হয়।এই খেলায় হ্যাম্বলডনের ৫ জন খেলোয়াড় খেলেন, এরা ছিলেন যথাক্রমে ওয়াকার,স্মল,রবিন্সন,বেলদ্যাম ও নাইরেন।এই সেই নাইরেন যে “Cricketers of My age” গ্রন্থ লিখে হ্যাম্বল্ডন কে অমর করেছেন।ল্যাম্বারট অর্ধশতরান করেন যদিও তিনি প্লেয়ারস কিন্তু খেলেন জেন্টলম্যানদের হয়ে।খেলাটা হয়েছিল পুরোনো লর্ডসে মানে ডরসেট স্কোয়ারে। ঐ বছরই দ্বিতীয় খেলা হয়। তাতে ব্যুক্লার্ক প্রথম অ্যামেচার হিসেবে অর্ধশতরান করেন।
  তৃতীয় ম্যাচে প্লেয়ারসদের পৃষ্ঠপোষক লর্ড স্ট্যাথাভ্যানকে প্লেয়ারস দলে খেলানো হয়। এই ম্যাচেই প্রথম খেলতে নামেন প্লেয়ারসদের প্রথম শতরানকারি বেগলি আর জেন্টলম্যানদের প্রথম শতরানকারি কিংবদন্তী খেলোয়াড় উইলিয়াম ওয়ার্ড।এই খেলা হয় প্রায় ১৩ বছর পর ১৮১৯ সালে নতুন লর্ডস মাঠ মানে সেন্ট জন’স উডে।অনারেবল হেনরি সিসিল লোদার (উলস্টারের প্রথম ভাইকাউন্টের পূর্বপুরুষ- যিনি ১৯২২ সালে এম সি সির সভাপতি হন)। প্লেয়ারস দের হোয়ারড এই খেলায় ৮ উইকেট নেন।বেগলি ৭৫ রান করেন,শেরম্যান করেন ৫২(সবই প্লেয়ারসদের হয়ে,জেন্টলম্যানদের বার্ড ৪টে স্ট্যাম্প করেন ও ২টি উইকেট নেন।
  যাইহোক পঞ্চম খেলা হয় ১৮২১ সালে(চতুর্থ খেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ে আলোচনা করব)।মনে হয় এই খেলাটা হয়েছিল চতুর্থ জর্জের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে। তিনি প্রিন্স অফ ওয়েলশ থাকার সময় ভাল ক্রিকেট খেলতেন তার ঠাকুরদার মতো(ফ্রেডরিখ প্রিন্স অফ ওয়েলশ, যিনি পেটে বল লেগে টিউমার ফেটে মারা যান)। মজার ব্যাপার মেরিলিবোরন এর প্রথমদিকের ম্যাপে এই মাঠ মানে সেন্ট জন’স উডের নাম হল প্রিন্স অফ ওয়েলশ গ্রাউন্ড।ডাবলু সি পায়ার যিনি প্লেয়ারদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন তিনি এই ম্যাচে প্লেয়ারস দলে খেলে।এর কারন বোধহয় হ্যানভারিয় ঐতিহ্যের “ম্যাচ ফিক্সিং”(আজকের ভাষায়) বন্ধ করার চেষ্টা।ম্যাচ ড্র হয়। বেগলি শতরান করেন। পরের বছর প্রথমবার দুপক্ষ সমান দল নিয়ে খেলে।
   ১৮২৫ সালে নবম খেলা ছিল চার দিনের। ১৫৬ বছরে ২৭৭টি প্রথম শ্রেণির খেলার মধ্যে এই একটি ছিল চার দিনের ম্যাচ।এই খেলায় উইলিয়াম ওয়ার্ড ১০২ রান করেন। পরের ৪২ বছর জেন্টলম্যান দলের হয়ে আর কেউ শতরান করেননি। প্লেয়ারসদের সন্ডারস ৯৯ রান করেন। জেন্টলম্যান ছিল ১৬ জনের দল মানে তাদের ১৫ উইকেট পড়লে তবে অল আউট হবে। এই খেলায় বারনেট, বার্নার্ড, কিংস্কট, ডিডেস(সবাই জেন্টলম্যান দলের) পরবর্তী কালে এম সি সির সভাপতি ছিলেন।এই খেলা এবং এর পরের বছর জেন্টলম্যান দল জিতে যায়।পরের বছর মানে ১৮২৬ সালে তারা ১৭ জনের দল নিয়ে নামে(মনে রাখতে হবে, এই গুলো সব প্রথম শ্রেণির ম্যাচ হিসেবেই ধরা হয়)।
  ১৮২৭ সালে প্লেয়ারসদের সন্ডারস শতরান করেন (পুরো ১০০)। এবার জেন্টলম্যান ১৭ জনের দল গড়ে হেরে যায়।তাদের হয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সী এম সি সির সভাপতি কিংস্কট খেলেন। ইনি উইলিয়াম দ্য কংকয়ারার এর ভাইঝি ইভের বংশধর ছিলেন।গ্লস্টারশায়ারের কিংস্কট ক্লাব এঁদের নিজেদের ক্লাব ছিল।
     ১৮২৯ সালের খেলায় দেখছি প্লেয়ারসদের ব্যাটিং স্কোরশিটে ক্যাচ ও স্ট্যাম্পএর সাথে বোলারদের নাম আছে। কিন্তু জেন্টলম্যানদের ইনিংসে নেই।প্লেয়ারদের লিলিহোয়াইট জেন্টলম্যানদের হয়ে খেলে প্লেয়ারসদের ১২টা উইকেট নিয়েছিলেন।
 ১৮৩২ সালের ১৫তম খেলায় জেন্টলম্যান দলে ভিনসেন্ট কটন নামে এক বিখ্যাত জুয়াড়ি খেলেছিলেন(ইনি অনেকগুলো ম্যাচ খেলছেন যাকে প্রথম শ্রেণি ধরা হয়, এমনকি নিজের নামে দল করেও খেলেছেন)।
  ১৮৩৩ সালে শেষবারের মত এম সি সির তৎকালীন সভাপতি এই খেলায় খেলেন। তখনকার দিনে সক্রিয় অ্যামেচার ক্রিকেটাররাই এম সি সির সভপতি হত।যাই এই ব্যক্তি অর্থাৎ জেনার ৯৯ বছর বয়সে ১৯০৪ সালে মারা যান। প্রথম যুগের জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস খেলার একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিংশশতকে কিছুদিন জীবিত ছিলেন।এই খেলাতেই হেওয়ারড পরিবারের প্রথম কেউ অংশ নেন।
পরের বছর সেই যুগের মহান উইকেট রক্ষক টম বক্স প্রথম খেলেন। বিখ্যাত ব্যাটসম্যান ফুলারপিচ ৬০ করেন প্লেয়ারসদের হয়ে।
১৮৩৬ সালের ১৯ তম ম্যাচ ছিল ঐতিহাসিক। প্রথম আধুনিক স্কোর পাওয়া যাচ্ছে।
 ১৮৩৭ সালের খেলা বেশ মজার।প্লেয়ারসরা ব্যাট করতে নামে ৪টে করে স্ট্যাম্প নিয়ে। সেগুলি আকৃতিতেও বিরাট। ৩ ফুট লম্বা আর একফুট বেধ। মানে বল ফসকালেই আউট। কিন্তু জেন্টলম্যান খেলতে নামে তিনটে উইকেট নিয়ে যা স্বাভাবিক মানের অর্থাৎ ২৭ ইঞ্চি লম্বা আর ৮ ইঞ্চি বেধ। উইলিয়াম ওয়ার্ডের এই অদ্ভুত নিয়ম সত্বেও প্লেয়ারস(৯৯ রান) এক ইনিংস ও ১০ রানে জেতে। লিলহোয়াইট প্রথম এক ইনিংসে ৯ উইকেট নেয়(ম্যাচে ১৩টি)।এই ঐতিহাসিক খেলার নাম “বান ডোর” ম্যাচ(প্রথম শ্রেণি)।
ঐ বছরের জুলাই মাসের শেষে ২১ তম খেলা হয় রানী ভিক্টোরিয়ার রাজ্যাভিষেকের সন্মানে। ১৬ জন জেন্টলম্যান দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১৬ রান করে (মানে ৩০ উইকেটে)। লিলিহোয়াইট একাই ১৮টি উইকেট নেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ খানা(প্রথম শ্রেণির খেলায় এটাই নাকি প্রথম ১০ উইকেট)।
   পরের বছর উইলিয়াম ওয়ার্ড খেলা ছেড়ে দেন ঠিক ৫১ বছর বয়সে। গ্রেস ও এই বয়সে টেস্ট ও লর্ডসের জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস খেলা ছেড়ে দেন।যাই হোক এই খেলার জন্য ওয়ার্ডের অবদান কেউ ভুলবে না।১৮২৫ সালে যখন লর্ডসে আগুন লাগে তখন তাকে পুনরায় খেলার জন্য প্রস্তুত করায় তার ভূমিকা ছিল বিরাট।উল্লেখযোগ্য এই আগুনেই হ্যাম্বলডনের সেই কাঠের মধ্যে আঁচড় কাটা স্কোর গুলি পুড়ে যায় যা ক্রিকেটের ইতিহাসের বিরাট ক্ষতি।
১৮৪০ সালের খেলা(২৪ তম খেলা)কে “আউট অফ ফ্লেভার” বলা হয়েছিল। আসলে জেন্টলম্যানরা বারবার হেরে যাওয়ায় “লেগস”(মানে তখনকার “বুকি”)রা উৎসাহ পাচ্ছিল না।যাই হোক প্রথম ওভার সহ উইকেট এর হিসেব(রান ছাড়া) এই ম্যাচ থেকেই পাওয়া যায়।
 ১৮৪২ সালের ২৬ তম ম্যাচ থেকে পাক্কা কুড়ি বছর পর জেন্টলম্যান দল “অড” ছাড়া (মানে ১১ জনের বেশি দল) প্রথম জয় পায়। ফেলিক্সের ৮৮ রান ও ৯ উইকেটই এর কারন।
১৮৪৪ সালের খেলায় ২৮ তম ম্যাচে ‘মেডেন’ ওভার ছাড়া পুরো বোলিং এর হিসাব প্রথম পাওয়া যায়।
১৮৪৬ সালের খেলায় ১৮৬৫ সাল অবধি খেলা জর্জ পার এবং “Cricket scores and biography” গ্রন্থের লেখক হোগার্ড প্রথম খেলেন।
 ১৮৪৮ সালে (ঐ বছর যখন ম্যাচ খেলা হয় তার দু সপ্তাহ বাদে ডাবলু জি গ্রেস জন্মান) যে ম্যাচ খেলা হয় তাতে আর টি কিং দ্বিতীয় ইনিংসে পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ৩ টি ক্যাচ লোফেন। এই পয়েন্ট কিন্তু আজকের পয়েন্ট নয়। এটা পুরনো পয়েন্ট। উইকেটের খুব কাছে স্কোয়ার অফ উইকেট দাঁড়াত ফিল্ডার।এই পজিশনটা আজ উঠে গেছে। ই এম গ্রেস এখানেই দাঁড়াত। ডাবলু জি গ্রেস ১৮৮০-৯০ সাল নাগাদ কয়েকটা টেস্ট ম্যাচে এইখানে দাঁড়ায়। সেই যুগে ট্রট,নোবল,অস্ট্রেলিয়ার লেভার,ডার্বিশায়ারের রাইট এখানে ভাল ফিল্ডিং করত।এই খেলায় জন উইসডেন প্লেয়ারস দলের হয়ে খেলন(উইডেন অ্যালমানাকের জন্মদাতা)।
  পরের বছর লিলিহোয়াইট ও ফুলারপিচ শেষবার খেলেন।
  ১৮৫৪ সালে ৪০তম খেলায় শেশবার খেললেন স্যার ফ্রেডরিখ বাথারড। ২৩ বছর ধরে তিনি ৭৩টা উইকেট নেন জেন্টলম্যানদের জন্য।এই বছর কোনও অল ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়দের উইলিয়াম ক্লার্ক খেলতে দেননি।তিনি ও টম বক্স তার আগের বছর শেষ খেলেছিলেন।
১৮৫৬ সালে সারের জুলিয়াস সিজারের অভিষেক হয় এই খেলায়। এডগার উইলক্সশায়ার ও ঐ বছর প্রথম খেলেন।
 ১৮৫৭ সালে ওভালে প্রথম জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস প্রথম খেলা হয়।চার বছর এখানে জেন্টলম্যান জিততে পারেনি।সারের সি জি লোর প্রথম খেলে।
 ১৮৬০ সালে ৩৩ বছর পর ওভালে প্লেয়ারস দের কারপেন্টার ১১৯ করে শতরান করেন। ঐ বছর ফিরতি খেলায় লর্ডসে ৫০ তম ম্যাচে ক্যাফিন প্লেয়ারসদের হয়ে ১০২ করেন।পরের বছর কারপেন্টার ১০৬ রান করেন।তার পরের বছর ১৮৬২ সালে লর্ডসে ই এম গ্রেস জেন্টলম্যানদের হয়ে খেলতে নামেন।বাবার রাস্তা ধরে জন লিলিহোয়াইট প্লেয়ারসদের হয়ে ২৯ রানে ৮ উইকেট নেন।
১৮৬৩ সালের হেওয়ারড ১১২ করেন। ই এম গ্রেস লর্ডসে ৫৫ রানে ৫ উইকেট নেন। তিনি ঐ বছর ওভালেও ১০১ রানে ৫ উইকেট নেন।
১৮৬৪ সালে পেলহ্যাম ওয়ারনারের মতে প্রথম বা আদি যুগের শেষ বছর প্লেয়ারসদের স্টিফেন্সন ১১৭ রান করে ওভালে। পুরো ম্যাচে ১০০০ এর বেশি রান ওঠে। লর্ডসে জেন্টলম্যানদের আর্করাইট ৩৮ রানে ৭ উইকেট নেয়। তিনি ১৮৬৬ সালে ম ব্লাতে তুষারধ্বসে মারা যান।
  পরের পোস্টে থাকবে প্রথম যুগের কিছু পরিসংখ্যান।  


No comments:

Post a Comment