Tuesday, 24 May 2016

জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারসঃ প্রথম যুগ নিয়ে আরও কিছু কথা

জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারসের খেলা শুরু হয়েছিল ১৮০৬ সালে তা আগেই বলেছি। এই খেলা নিয়ে আগেই দুটি পোস্ট করেছি।এখন যা পরে থাকছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য বহুল বিষয় যা একই সাথে চমকপ্রদও বটে।
    জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারসদের খেলার প্রথম যুগ অর্থাৎ ১৮০৬ সাল থেকে ১৮৬৪ সাল অবধি ছিল প্লেয়ারসদের দাপট।এই সময়ে জেন্টলম্যান দল খুব একটা ভাল খেলেনি।বহু ক্ষেত্রে প্লেয়ারসদের থেকে খেলোয়াড় নিয়ে দল পূর্ণ হত।একথাও ঠিক যে সমান সমান সংখ্যক খেলোয়াড় নিয়ে তারা মাত্র ৭টা ম্যাচ জেতে।
   প্রথম ম্যাচেই প্লেয়ারস বেলদ্যাম ও ল্যাম্বারট কে জেন্টলম্যান দলে নেওয়া হয়।এই খেলায় হ্যাম্বলডনের ৫ জন খেলোয়াড় খেলেন, এরা ছিলেন যথাক্রমে ওয়াকার,স্মল,রবিন্সন,বেলদ্যাম ও নাইরেন।এই সেই নাইরেন যে “Cricketers of My age” গ্রন্থ লিখে হ্যাম্বল্ডন কে অমর করেছেন।ল্যাম্বারট অর্ধশতরান করেন যদিও তিনি প্লেয়ারস কিন্তু খেলেন জেন্টলম্যানদের হয়ে।খেলাটা হয়েছিল পুরোনো লর্ডসে মানে ডরসেট স্কোয়ারে। ঐ বছরই দ্বিতীয় খেলা হয়। তাতে ব্যুক্লার্ক প্রথম অ্যামেচার হিসেবে অর্ধশতরান করেন।
  তৃতীয় ম্যাচে প্লেয়ারসদের পৃষ্ঠপোষক লর্ড স্ট্যাথাভ্যানকে প্লেয়ারস দলে খেলানো হয়। এই ম্যাচেই প্রথম খেলতে নামেন প্লেয়ারসদের প্রথম শতরানকারি বেগলি আর জেন্টলম্যানদের প্রথম শতরানকারি কিংবদন্তী খেলোয়াড় উইলিয়াম ওয়ার্ড।এই খেলা হয় প্রায় ১৩ বছর পর ১৮১৯ সালে নতুন লর্ডস মাঠ মানে সেন্ট জন’স উডে।অনারেবল হেনরি সিসিল লোদার (উলস্টারের প্রথম ভাইকাউন্টের পূর্বপুরুষ- যিনি ১৯২২ সালে এম সি সির সভাপতি হন)। প্লেয়ারস দের হোয়ারড এই খেলায় ৮ উইকেট নেন।বেগলি ৭৫ রান করেন,শেরম্যান করেন ৫২(সবই প্লেয়ারসদের হয়ে,জেন্টলম্যানদের বার্ড ৪টে স্ট্যাম্প করেন ও ২টি উইকেট নেন।
  যাইহোক পঞ্চম খেলা হয় ১৮২১ সালে(চতুর্থ খেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ে আলোচনা করব)।মনে হয় এই খেলাটা হয়েছিল চতুর্থ জর্জের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে। তিনি প্রিন্স অফ ওয়েলশ থাকার সময় ভাল ক্রিকেট খেলতেন তার ঠাকুরদার মতো(ফ্রেডরিখ প্রিন্স অফ ওয়েলশ, যিনি পেটে বল লেগে টিউমার ফেটে মারা যান)। মজার ব্যাপার মেরিলিবোরন এর প্রথমদিকের ম্যাপে এই মাঠ মানে সেন্ট জন’স উডের নাম হল প্রিন্স অফ ওয়েলশ গ্রাউন্ড।ডাবলু সি পায়ার যিনি প্লেয়ারদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন তিনি এই ম্যাচে প্লেয়ারস দলে খেলে।এর কারন বোধহয় হ্যানভারিয় ঐতিহ্যের “ম্যাচ ফিক্সিং”(আজকের ভাষায়) বন্ধ করার চেষ্টা।ম্যাচ ড্র হয়। বেগলি শতরান করেন। পরের বছর প্রথমবার দুপক্ষ সমান দল নিয়ে খেলে।
   ১৮২৫ সালে নবম খেলা ছিল চার দিনের। ১৫৬ বছরে ২৭৭টি প্রথম শ্রেণির খেলার মধ্যে এই একটি ছিল চার দিনের ম্যাচ।এই খেলায় উইলিয়াম ওয়ার্ড ১০২ রান করেন। পরের ৪২ বছর জেন্টলম্যান দলের হয়ে আর কেউ শতরান করেননি। প্লেয়ারসদের সন্ডারস ৯৯ রান করেন। জেন্টলম্যান ছিল ১৬ জনের দল মানে তাদের ১৫ উইকেট পড়লে তবে অল আউট হবে। এই খেলায় বারনেট, বার্নার্ড, কিংস্কট, ডিডেস(সবাই জেন্টলম্যান দলের) পরবর্তী কালে এম সি সির সভাপতি ছিলেন।এই খেলা এবং এর পরের বছর জেন্টলম্যান দল জিতে যায়।পরের বছর মানে ১৮২৬ সালে তারা ১৭ জনের দল নিয়ে নামে(মনে রাখতে হবে, এই গুলো সব প্রথম শ্রেণির ম্যাচ হিসেবেই ধরা হয়)।
  ১৮২৭ সালে প্লেয়ারসদের সন্ডারস শতরান করেন (পুরো ১০০)। এবার জেন্টলম্যান ১৭ জনের দল গড়ে হেরে যায়।তাদের হয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সী এম সি সির সভাপতি কিংস্কট খেলেন। ইনি উইলিয়াম দ্য কংকয়ারার এর ভাইঝি ইভের বংশধর ছিলেন।গ্লস্টারশায়ারের কিংস্কট ক্লাব এঁদের নিজেদের ক্লাব ছিল।
     ১৮২৯ সালের খেলায় দেখছি প্লেয়ারসদের ব্যাটিং স্কোরশিটে ক্যাচ ও স্ট্যাম্পএর সাথে বোলারদের নাম আছে। কিন্তু জেন্টলম্যানদের ইনিংসে নেই।প্লেয়ারদের লিলিহোয়াইট জেন্টলম্যানদের হয়ে খেলে প্লেয়ারসদের ১২টা উইকেট নিয়েছিলেন।
 ১৮৩২ সালের ১৫তম খেলায় জেন্টলম্যান দলে ভিনসেন্ট কটন নামে এক বিখ্যাত জুয়াড়ি খেলেছিলেন(ইনি অনেকগুলো ম্যাচ খেলছেন যাকে প্রথম শ্রেণি ধরা হয়, এমনকি নিজের নামে দল করেও খেলেছেন)।
  ১৮৩৩ সালে শেষবারের মত এম সি সির তৎকালীন সভাপতি এই খেলায় খেলেন। তখনকার দিনে সক্রিয় অ্যামেচার ক্রিকেটাররাই এম সি সির সভপতি হত।যাই এই ব্যক্তি অর্থাৎ জেনার ৯৯ বছর বয়সে ১৯০৪ সালে মারা যান। প্রথম যুগের জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস খেলার একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিংশশতকে কিছুদিন জীবিত ছিলেন।এই খেলাতেই হেওয়ারড পরিবারের প্রথম কেউ অংশ নেন।
পরের বছর সেই যুগের মহান উইকেট রক্ষক টম বক্স প্রথম খেলেন। বিখ্যাত ব্যাটসম্যান ফুলারপিচ ৬০ করেন প্লেয়ারসদের হয়ে।
১৮৩৬ সালের ১৯ তম ম্যাচ ছিল ঐতিহাসিক। প্রথম আধুনিক স্কোর পাওয়া যাচ্ছে।
 ১৮৩৭ সালের খেলা বেশ মজার।প্লেয়ারসরা ব্যাট করতে নামে ৪টে করে স্ট্যাম্প নিয়ে। সেগুলি আকৃতিতেও বিরাট। ৩ ফুট লম্বা আর একফুট বেধ। মানে বল ফসকালেই আউট। কিন্তু জেন্টলম্যান খেলতে নামে তিনটে উইকেট নিয়ে যা স্বাভাবিক মানের অর্থাৎ ২৭ ইঞ্চি লম্বা আর ৮ ইঞ্চি বেধ। উইলিয়াম ওয়ার্ডের এই অদ্ভুত নিয়ম সত্বেও প্লেয়ারস(৯৯ রান) এক ইনিংস ও ১০ রানে জেতে। লিলহোয়াইট প্রথম এক ইনিংসে ৯ উইকেট নেয়(ম্যাচে ১৩টি)।এই ঐতিহাসিক খেলার নাম “বান ডোর” ম্যাচ(প্রথম শ্রেণি)।
ঐ বছরের জুলাই মাসের শেষে ২১ তম খেলা হয় রানী ভিক্টোরিয়ার রাজ্যাভিষেকের সন্মানে। ১৬ জন জেন্টলম্যান দুই ইনিংস মিলিয়ে ১১৬ রান করে (মানে ৩০ উইকেটে)। লিলিহোয়াইট একাই ১৮টি উইকেট নেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে ১০ খানা(প্রথম শ্রেণির খেলায় এটাই নাকি প্রথম ১০ উইকেট)।
   পরের বছর উইলিয়াম ওয়ার্ড খেলা ছেড়ে দেন ঠিক ৫১ বছর বয়সে। গ্রেস ও এই বয়সে টেস্ট ও লর্ডসের জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস খেলা ছেড়ে দেন।যাই হোক এই খেলার জন্য ওয়ার্ডের অবদান কেউ ভুলবে না।১৮২৫ সালে যখন লর্ডসে আগুন লাগে তখন তাকে পুনরায় খেলার জন্য প্রস্তুত করায় তার ভূমিকা ছিল বিরাট।উল্লেখযোগ্য এই আগুনেই হ্যাম্বলডনের সেই কাঠের মধ্যে আঁচড় কাটা স্কোর গুলি পুড়ে যায় যা ক্রিকেটের ইতিহাসের বিরাট ক্ষতি।
১৮৪০ সালের খেলা(২৪ তম খেলা)কে “আউট অফ ফ্লেভার” বলা হয়েছিল। আসলে জেন্টলম্যানরা বারবার হেরে যাওয়ায় “লেগস”(মানে তখনকার “বুকি”)রা উৎসাহ পাচ্ছিল না।যাই হোক প্রথম ওভার সহ উইকেট এর হিসেব(রান ছাড়া) এই ম্যাচ থেকেই পাওয়া যায়।
 ১৮৪২ সালের ২৬ তম ম্যাচ থেকে পাক্কা কুড়ি বছর পর জেন্টলম্যান দল “অড” ছাড়া (মানে ১১ জনের বেশি দল) প্রথম জয় পায়। ফেলিক্সের ৮৮ রান ও ৯ উইকেটই এর কারন।
১৮৪৪ সালের খেলায় ২৮ তম ম্যাচে ‘মেডেন’ ওভার ছাড়া পুরো বোলিং এর হিসাব প্রথম পাওয়া যায়।
১৮৪৬ সালের খেলায় ১৮৬৫ সাল অবধি খেলা জর্জ পার এবং “Cricket scores and biography” গ্রন্থের লেখক হোগার্ড প্রথম খেলেন।
 ১৮৪৮ সালে (ঐ বছর যখন ম্যাচ খেলা হয় তার দু সপ্তাহ বাদে ডাবলু জি গ্রেস জন্মান) যে ম্যাচ খেলা হয় তাতে আর টি কিং দ্বিতীয় ইনিংসে পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ৩ টি ক্যাচ লোফেন। এই পয়েন্ট কিন্তু আজকের পয়েন্ট নয়। এটা পুরনো পয়েন্ট। উইকেটের খুব কাছে স্কোয়ার অফ উইকেট দাঁড়াত ফিল্ডার।এই পজিশনটা আজ উঠে গেছে। ই এম গ্রেস এখানেই দাঁড়াত। ডাবলু জি গ্রেস ১৮৮০-৯০ সাল নাগাদ কয়েকটা টেস্ট ম্যাচে এইখানে দাঁড়ায়। সেই যুগে ট্রট,নোবল,অস্ট্রেলিয়ার লেভার,ডার্বিশায়ারের রাইট এখানে ভাল ফিল্ডিং করত।এই খেলায় জন উইসডেন প্লেয়ারস দলের হয়ে খেলন(উইডেন অ্যালমানাকের জন্মদাতা)।
  পরের বছর লিলিহোয়াইট ও ফুলারপিচ শেষবার খেলেন।
  ১৮৫৪ সালে ৪০তম খেলায় শেশবার খেললেন স্যার ফ্রেডরিখ বাথারড। ২৩ বছর ধরে তিনি ৭৩টা উইকেট নেন জেন্টলম্যানদের জন্য।এই বছর কোনও অল ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়দের উইলিয়াম ক্লার্ক খেলতে দেননি।তিনি ও টম বক্স তার আগের বছর শেষ খেলেছিলেন।
১৮৫৬ সালে সারের জুলিয়াস সিজারের অভিষেক হয় এই খেলায়। এডগার উইলক্সশায়ার ও ঐ বছর প্রথম খেলেন।
 ১৮৫৭ সালে ওভালে প্রথম জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস প্রথম খেলা হয়।চার বছর এখানে জেন্টলম্যান জিততে পারেনি।সারের সি জি লোর প্রথম খেলে।
 ১৮৬০ সালে ৩৩ বছর পর ওভালে প্লেয়ারস দের কারপেন্টার ১১৯ করে শতরান করেন। ঐ বছর ফিরতি খেলায় লর্ডসে ৫০ তম ম্যাচে ক্যাফিন প্লেয়ারসদের হয়ে ১০২ করেন।পরের বছর কারপেন্টার ১০৬ রান করেন।তার পরের বছর ১৮৬২ সালে লর্ডসে ই এম গ্রেস জেন্টলম্যানদের হয়ে খেলতে নামেন।বাবার রাস্তা ধরে জন লিলিহোয়াইট প্লেয়ারসদের হয়ে ২৯ রানে ৮ উইকেট নেন।
১৮৬৩ সালের হেওয়ারড ১১২ করেন। ই এম গ্রেস লর্ডসে ৫৫ রানে ৫ উইকেট নেন। তিনি ঐ বছর ওভালেও ১০১ রানে ৫ উইকেট নেন।
১৮৬৪ সালে পেলহ্যাম ওয়ারনারের মতে প্রথম বা আদি যুগের শেষ বছর প্লেয়ারসদের স্টিফেন্সন ১১৭ রান করে ওভালে। পুরো ম্যাচে ১০০০ এর বেশি রান ওঠে। লর্ডসে জেন্টলম্যানদের আর্করাইট ৩৮ রানে ৭ উইকেট নেয়। তিনি ১৮৬৬ সালে ম ব্লাতে তুষারধ্বসে মারা যান।
  পরের পোস্টে থাকবে প্রথম যুগের কিছু পরিসংখ্যান।  


Wednesday, 18 May 2016

জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারবঃদ্বিতীয় পর্ব

বেটিং, দুর্নীতি এবং পেশাদারিত্ব এই ছিল জর্জীয় বা হ্যানভারিয় যুগের ইংলিশ ক্রিকেট। ভিক্টোরীয় যুগ প্রথম দুটিকে বাদ দিয়ে তৃতীয়টিকে নিয়ে পথচলা শুরু করে যদিও পেশাদারিত্বের চেহারা কিন্তু জর্জীয় যুগেরই ছিল। যদিও এই পেশাদারিত্ব ছিল তাদের কাছে গলার কাঁটা। এবং এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে পেশাদাররাই ভিক্টোরীয়দের খেলা শেখায় এবং খেলাটিতে বিপণন যুক্ত করে। পেশাদাররা না থাকলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট জিনিসটার জন্ম সম্ভব হত না।
  পেশাদারদের চাকরের চোখে দেখা হত, এবং অধিকাংশ বোলাররা উঠে এসেছিল (বিশেষতঃ ফাস্ট বোলাররা) পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে, ফলে ধারনা হয়ে গিয়েছিল যে প্রভুরা ব্যাট করেন, আর চাকরেরা বল করে। আজও ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের প্রাধান্য এই কারনে। এমনকি নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত যাবতীয় সবকিছু বোলিংকে ঘিরে বা ফিল্ডিংকে ঘিরে।  
  শ্রেণি বৈষম্য এই কারনে সাঙ্ঘাতিক ভাবে চোখে পরে এই জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস খেলা কে ঘিরে।
  যাই হোক আমরা আবার খেলায় ফিরি। বেশ কিছু ভাল উইকেট-কিপার খেলতেন যেমন বক্স,লকেয়ার,ডাকওয়রথ, স্ত্রাডউইক,স্মিথ,অ্যামেস...এরা সবাই পেশাদার,আবার জেন্টলম্যান দলে খেলত রাইডিং,রাউন্ড,নিউটন,ম্যাকগ্রেগররা।
       বিশ শতকে অস্ট্রেলীয় দলের সাথে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে যায়, ফলে ওভালের খেলা ১৯৩৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় যদিও লর্ডসে ১৯৬২ সাল অবধি চলেছিল।
  হবস ১৯০৫ সালে প্রথম শ্রেণি খেলা শুরু করেন যে সময়কে ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের শেষ পর্যায় বলা হত।যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সাথে সাথে সমাপ্ত হয়ে যায়।এই সময় আমরা কিছু মহান পেশাদার খেলোয়াড়দের নাম পাই যেমন স্রসবেরি,গুন,অ্যাবেল,লকউড এবং মহান অ্যামেচারদের নাম ও উঠে আসে যেমন ম্যাকলারেন,জ্যাকসন(সেই বাংলার গভর্নর),রঞ্জী,বসাঙ্কয়েট(গুগলি বলের জন্মদাতা) প্রভৃতি।
 এই যুগের মহান পেশাদার বোলাররা ছিলেন ফ্রিম্যান,মরিসটেট,হ্যাডলি ভেরিটি,বিল ভোস এবং হ্যারল্ড লারউড। একথাও বলা চলে যে সিম্পসন বা এডরিচ আসার আগে অবধি জেন্টলম্যান দলে ভাল ব্যাটসম্যান সেই অর্থে ছিল না।
 বেশ কিছু বড় মাপের অলরাউন্ডার ছিল এই সময় যেমন গাবি অ্যালেন,রবিন্স।
এবার কিছু স্মৃতিচারণা। প্রথম ম্যাচের (১৮০৬) দিকে তাকালে দেখতে পারব যে টি ওয়াকার,বেলডাম আর স্মল সেই হ্যাম্বল্ডন যুগের লোক।এবং জন নাইরেন তো সেই হ্যাম্বলডন কে অমর করেছিলেন “ক্রিকেটার অফ মাই টাইমস” বই লিখে, তিনিও খেলেছিলেন। ছিলেন বুক্লার্ক যিনি প্রথম জেন্টলম্যান দলের হয়ে ৫০ রান করেন।

  সেখান থেকে আমরা এই যুগে এলে পাবো হবসকে যিনি বিশ্বযুদ্ধ পূর্ব যুগের ক্রিকেটের সাথে সেতু ছিলেন।এবং সেখান থেকে সর্বশেষ খেলায় ট্রুম্যান,ব্যারিংটন,ক্লোস ...তারপর ...... বিশ শতকের আধুনিক ক্রিকেটের যুগে গা ভাসিয়ে বিদায় নিল গ্রাম্য খেলা ক্রিকেটকে জাতীয় খেলাতে পরিনত করার সর্বাপেক্ষা বড় অবদান ছিল যে ম্যাচের ...যে খেলায় অংশ নিতে পেরে ধন্য হতেন মহান ক্রিকেটাররা সেই “জেন্টলম্যান ভার্সেস প্লেয়ারস”...। 

Tuesday, 17 May 2016

জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস

যতদূর জানা যায় যে জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস খেলা প্রথম হয়েছিল ১৮০৬ সালে লর্ডসে। পরে অবশ্য অনেক জায়গাতেই হয়েছে। তবে হ্যাঁ, ওভালের যে খেলা গুলি হয়েছিল (তা মোটামুটিভাবে ১৮৫৭ থেকে ১৯৩৪ সালের মধ্যে- এবং অবশ্যই ১৯৩০-১৯৩৩ সালের সংক্ষিপ্ত পর্বের ছেদ ঘটার সময়কে বাদ দিলে) তাকে লর্ডসের খেলারই একটি বিশেষ সংস্করণ বলা যায়। যদিও অতিরিক্ত ক্রিকেটের জন্য প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীকালে সমস্যা হয় এবং ম্যাচ গুলি খুব একটা প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল না।
     কিন্তু লর্ডসের খেলা সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে টেস্ট ম্যাচ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার আগে।এই খেলায় আমন্ত্রন পাওয়া ছিল সর্বদা বিশেষ ভাবে সম্মানের। আর এইচ লিটেল্টন লিখেছেন “In conclusion, let us express a hope that the Gentlemen and Players match will never fall through; for , having been played on and off since 1806,it has a notable history, and it ought to be the summit of ambition of every cricketer, be he amateur or professional, to appear in the great classic contest.
   ১৮০৬ সালের আগেও এই ধাঁচের খেলা আয়োজন করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু তা আদৌ হয়েছেইল কিনা তা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। বলা হয় ১৭৯৮ সালে জেন্টলম্যান বনাম কমনারস নামে খেলা হয়।আর দুটি খেলা মোসলে-হারস্ট এবং কক্সহেচ নামে আরও দুই জায়গায় হওয়ার কথা ছিল কিন্তু বোধহয় হয়নি।
       অ্যামেচার শব্দটি ফরাসি শব্দ যা ইংরেজি ভাষায় খেলাধুলা সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে যুক্ত হয় ১৮০৪ সাল থেকে। বহু বছর আগে থেকেই ক্রিকেট সংক্রান্ত ক্লাব গুলোর খরচ-পাতির তালিকায় “ খেলোয়াড়দের পেমেন্ট” নামে আলাদা হিসাব থাকত। যদিও “পেশাদার” বলতে বিশ শতকের প্রথমে বা উনিশ শতকে যা বলত তা এটা নয়। এমনকি আজকের দিনেও “পেশাদার ক্রিকেটার” ব্যাপারটা অনেক ভিন্ন।  
    যাই হোক প্রথম যুগে যখন বেটিং বৈধ ছিল তখন “খেলোয়াড়” মানে প্লেয়ারস দের দাপটে খেলা কৌলীন্য হারাচ্ছিল। শুধু সামান্য কিছু “ জেন্টলম্যান” খেলা অন্যরকম করে তুলত যার মধ্যে একজন ছিলেন উইলিয়াম ওয়ার্ড।যিনি লর্ডস কে “বিল্ডারস” দের হাত থেকে বাঁচান। ১৮২৮ সালে তার করা ২৭৮ রান ১৮৭৬ অবধি প্রথম শ্রেণি ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান ছিল। এই রান তিনি করেছিলেন এম সি সি এর পক্ষে নরফোকের বিরুদ্ধে(নরফোক এখন প্রথম শ্রেণি খেলে না, মাইনর কাউন্টি দল)। 
  লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে ১৮০৬ থেকে ১৮৬৫ অবধি জেন্টলম্যান দল মাত্র ১৫টি খেলায় যেতে। ১৮৫৩ সাল থেকে শেষ ১২ বছর একটাও জেতেনি,১৮৩৭ থেকে মাত্র ৭টি জিতেছিল। কিন্তু ১৮৬৫ থেকে পুরো ব্যাপারটা আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তী ১৮ বছরে তারা হেরেছিল মাত্র ৭টি ম্যাচ কারন “একমেবঃদ্বিতিয়ম” উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস।
    পৃথিবীর কোনও ধরনের প্রতিনিধিত্বমূলক খেলায়  গ্রেসের মত অলরাউন্ড দক্ষতা খুব কমই আছে। ৬০০৮ রান,২৭১টা উইকেট।যাই হোক গ্রেস লর্ডসের ম্যাচ খেলা ১৮৯৯ সালেই ছেড়ে দেন, যদিও ওভালের খেলায় ১৯০৬ অবধি তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
আবার মজার ব্যাপার ১৮৮০ বা ১৮৯০ এর দশকে প্লেয়ারসরা ৬ জনের কম বোলার নিয়ে খেলেছে খুব কম। কখনবা ৭ এমনকি ৮ জন বোলার নিয়েও খেলেছে। জেন্টলম্যান দলে চিরকাল ভাল ব্যাটসম্যানরা খেলে গেছেন যেখানে পেশাদাররা বোলিং সবসময়েই ভাল করেছেন।
   এবার আশা যাক অনন্য কিছু কৃতিত্বে। ১৮৭৫ সালে গেস ছিলেন মারাত্মক ফর্মে। তিনি ঐ বছর ১৪৯৮ রান করেন আর ১৯২টা উইকেট নেন। বহুদিন পরে ১৯০৬ সালে জর্জ হার্স্ট ২৩৮৫ রান করেন আর ২০৮টা উইকেট নেন। ১৯৩৭ সালে পার্কস সেই রেকর্ড ভেঙ্গে দেন ৩০০৩ রান আর ১০১ উইকেট নিয়ে। যাই হোক ঐ ১৮৭৫ সালে গ্রেস লর্ডসে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫২ রান করেন আর ১২৫ রানে ১২ উইকেট নেন।
    যাই হোক ১৮৯০ থেকেই সব বদলাচ্ছিল। গ্রেস তার একটি রচনায় লেখেন (১৮৯০ সালে)-“The professional are now the equals of the amateurs in batting and fielding, and their superior in bowling”. এক্ষেত্রে বিশেষ করে বলতেই হবে এস এম যে উডসের কথা। জেন্টলম্যান দলের উডসের মত কোনও বোলার ছিলই না। তিনি মাত্র ১৯.৯ গড়ে ৭৫ উইকেট নেন ১৮৮৮ সালে। যা কিনা টম রিচার্ডসনের ২০.৭ গড়ে ৬৩ উইকেটের থেকে ভাল ছিল।
      উনবিংশ শতকে ডগলাস খুব ভাল বোলার ছিলেন। এবং অবশ্যই বুচানন। যিনি ১৮৭৪ সালে অবসর নিলে জেন্টলম্যান দল সমস্যায় পড়ে গিয়েছিল। যে সমস্যা ১৯১৪ সালে গিয়ে শেষ হয় জে জি হোয়াইট আসার পর।  এছাড়া অবশ্যই উল্লেখ করার মত বোলার ছিলেন পিটে, পিল, ব্রিগস,রোডস,ব্লাইথ, লিলিহোয়াইট প্রভৃতিরা।
   এবং প্লেয়ার্স দলেও ছিলেন শ’,উইলশার,এমেট,মরলে,হার্স্ট  ইত্যাদিরা।
   প্রথম দিকে সেঞ্চুরি তো হতইনা। বিশেষ করে জেন্টলম্যানদের। ১৮২৫ সালের পর ঐ দলের সেঞ্চুরি আসে ১৮৬৭ সালে যেবার লাবক ১০৭ করল।তাও ওভালে। সেই উইলিয়াম ওয়ার্ড করেছিলেন ১৮২৫ এ লর্ডসে ১০২, তারপর। কিন্তু সব বদলে গেল গ্রেসের জন্য। ১৮৬৮ থেকে ১৮৮৫ গ্রেস একাই করল ১৩টা। এরপর ১৮৯৪ আর ১৮৯৫ সালে আরও দুটো। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭৫ সালের মধ্যে ৯খানা ছিল এমন বোলিং এর বিরুদ্ধে যাকে অনায়াসে ইংল্যান্ড দলের বোলিং বলা যায়। যাই হোক ১৮৯৯ সালে আরও একটা সেঞ্চুরি তিনি করেন, এবং সর্বশেষটা আসে (যদিও সেটা সেঞ্চুরি নয়, ৭৪) ১৯০৬ সালে ৫৮ বছর বয়সে। যাই হোক এরপর থেকে হবস যুগের সুত্রপাত। জেন্টলম্যান বনাম প্লেয়ারস নিয়ে আরও কথা বাকি যা পরে হবে।


Thursday, 5 May 2016

ভারতের প্রথম ইংল্যান্ড সফর (প্রথম পর্ব)

১৯১১ সালে ভারতীয় দল প্রথম ইংল্যান্ড সফরে যায়।ঠিক হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াতেও যাওয়া হবে কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।দলের নেতৃত্বে ছিলেন পাতিয়ালার মহারাজা [১]।দলের অন্যান্যরা ছিলেন কে এম মিস্ত্রী[২],কাঙ্গা[৩],মেহেরহোমজী[৪],শিবরাম[৫],সালামউদ্দিন[৬],ওয়ার্ডেন[৭],জয়রাম
[৮],গায়কোয়াড়[৯],বাজানা[১০],মুল্লা[১১],পি বালু[১২],শফকৎ[১৩],সৈয়দ হুসেন[১৪],বালসারা[১৫],পাই[১৬] এবং শেষাচারী[১৭]।  
        ভারতের বোলিং যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও ব্যাটিং খুবই দুর্বল ছিল।গোটা সফরে মোট ৪৩ টা ইনিংসে ৮বার ১০০ রান তুলতে ব্যর্থ হয়।এর মধ্যে ছ'বার প্রথম শ্রেণির ম্যাচে।আরও তিন বার তাঁরা ১০০ করতে পারেনি যদিও সেগুলি অসমাপ্ত ইনিংস ছিল।অন্ততঃ আরও ১৭ বার তারা ২০০ তুলতে পারেনি।অর্থাৎ গোটা সফরে ৬৫.১১% ক্ষেত্রে তারা ২০০ রান তুলতে ব্যর্থ হয়।ফলে প্রথম শ্রেণির ৯টি সহ মোট ১১টি ম্যাচে যা ছিল সফরের প্রথম ১১টি ম্যাচ, তাতে তারা একটানা হেরে যায়।এই প্রথম ১১টি ম্যাচে ইনিংস প্রতি তাদের গড় রান ছিল মাত্র ১৪২। কিন্তু পরবর্তী ১২টি খেলায় তারা ৬টি তে জেতে যার মধ্যে ২টি ছিল প্রথম শ্রেণির খেলা।বাকি ৪ টি তে হারে ও দুটি ড্র করে।গোটা সফরে ১৪ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় মাত্র দুটি খেলায় ভারত জিতেছিল। ১০টা খেলায় হেরেছিল ।প্রথম শ্রেণির নয় এমন খেলায় তার ৫ টি তে হেরেছিল।যদিও শেষ ১২টি ম্যাচে তাদের ইনিংস প্রতি গড় ছিল ২৩৪/৮। তিন বার ভারত ৪০০ রান করে এই দ্বিতীয় ভাগে। এবং একবারও ১০০ এর নিচে আউট হয় নি।প্রথম শ্রেণির ম্যাচ গুলিতে ১৬টি অর্ধশতরান ও ৪টি শতরান হয়েছিল ভারতের পক্ষে।গোটা সফরে অবশ্য ৯টি শতরান ও ২৮টি অর্ধশতরান হয়।এর মধ্যে কাঙ্গা,বাজানা,শিবরাম এবং মেহেরহোমজী প্রথম শ্রেণিতে শতরান করেন।অন্য খেলা গুলিতে মেহেরহোমজী দুটি, শিবরাম,ওয়ার্ডেন এবং সালামুদ্দিন একটি করে শতরান করেন।প্রথম শ্রেণির খেলায় ভারতের সর্বচ্চো রান ছিল ৪৮১।লিচেস্টার এর বিরুদ্ধে।সর্বনিম্ন ৭৬।ওয়ারউইকশায়ারের বিরুদ্ধে।প্রথম শ্রেণির ম্যাচ নয় এমন খেলায় ভারতের সর্বচ্চো রান ছিল ৪৬৩/৬।লিঙ্কনের বিরুদ্ধে। এবং সর্বনিম্ন ৫১। সফরের দ্বিতীয় ম্যাচে সাউথ ওয়েলসের বিরুদ্ধে।ব্যক্তিগত সর্বচ্চো রান কাঙ্গা। ১৬৩,প্রথম শ্রেণির খেলায় লিচেস্টার এর বিরুদ্ধে।
      সফরের প্রথম খেলায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কাছে ভারত হারে (এই একবার মাত্র...তারপর গত ১০৫ বছরে আর হারেনি)।পরের খেলায় সাউথ ওয়েলসের বোলার হেপারের (ম্যাচে ১২/৮১) বোলিং ভারত কে বিধ্বস্ত করে।এরপর কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির খেলায় লকহার্ট ম্যাচে ১০২ রানে ১০ উইকেট নেয়।আর দ্বিতীয় ইনিংস এ ফ্যালকন ৫/৫০। ইনিংসে হারল ভারত (যথারীতি ১০৫ বছরে এই একবার)।ইতিমধ্যে ভারত এম সি সি এর সাথে বেসরকারি টেস্ট (বলা যেতেই পারে) খেলেছে।এবং হেরেওছে। তাও আবার ইনিংসে। এম সি সির এই দলে মাত্র দুজন টেস্ট খেলোয়াড় ছিলেন। নেভিল টাফনেল আর জন হারনে।আর একজন জ্যাক হারনে ঐ বছরের শেষে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট খেলেন। এরা কেউই খুব বড় কিছু নন। যাই হোক এরপর ওয়ারউইকশায়ারের বিরুদ্ধে খেলায় ভারত আবর লাইন লাগায়(দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কোল্যাপ্স নিয়ে আলাদা গবেষণা হওয়া উচিৎ)।ফস্টার(৫/৩১) আর ফিল্ড(৫/৩০) ভারত কে প্রথম ইনিংসে ৭৬ রানে নামিয়ে দেয়।দ্বিতীয় ইনিংসে কেঁদে-ককিয়ে ১৮৫ রান তুলেছিল ভারত।তাও ক্রুফোর্ড ৩৬ রানে ৬ উইকেট নেয়।এরপর লাঙ্ক‍্যাশায়ারের বিরুদ্ধে কুড (৫/২২) ও হুডলেটন (৫/৩০)দের জন্য ভারত কোনও ইনিংসেই ১০০ করতে পারেনি(৮৫ ও ৯৪)।একই অবস্থা স্ট্র্যাফোর্ডশায়ারের বিরুদ্ধে (৭৪ ও ৫৭)। কারন মহান সিডনি বার্নস (ম্যাচে ২৯ রানে ১৪ টি উইকেট)।যদিও স্ট্র্যাফোর্ডশায়ার কোনও প্রথম শ্রেণির না মাইনর কাউন্টী দল। সারের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংস ভাল খেললেও (২৬৪) দ্বিতীয় ইনিংসে আবার ধ্বস (১২০)। কারন হলেন সারের বার্ড (ম্যাচে ১০/৯৮)।কেন্টের ফেয়ারসার্ভিসকেও ভারত সামলাতে পারেনি(৫/৩৩)। এরপর নর্দাম্পটনশায়ার ও ইয়র্কশায়ারের কাছেও হারে ( ইয়র্কশায়ারকে অবশ্য ১৯৮৬ সাল অবধি হারান যায় নি......আর ঐ ১৯৮৬তেই শুধু...তারপর থেকে আজও "অধরা মাধুরী")।ইয়র্কের ড্রেক (৫/৫৫) ভাল বল করেন।
               এই ১১ টি খেলায় ভাল বল করেছিলেন একমাত্র বালু।বালু হয়ে উঠেছিলেন বিপক্ষের ত্রাস।স্টিকি ডগ উইকেটে তিনি ছিলেন ভয়ানক।তার বোলিং ছিল ভারতীয় দড়ির জাদুর মতই বিস্ময়কর। অক্সফোর্ডের বিরুদ্ধে ৫/৮৭,কেম্ব্রিজের বিরুদ্ধে ৮/১০৩(বালুর প্রথম শ্রেনিতে সেরা বোলিং),লাঙ্ক্যাশায়ারের বিরুদ্ধে ৭/৮৩,কেন্টের বিরুদ্ধে ৫/১০৯,নর্দাম্পটনের বিরুদ্ধে ৬/৫৮।শুধু বালুর জন্য স্ট্র্যাফোর্ডশায়ার কে ঐ ১৩২ রান তুলতে দু'ইনিংসে ১৫ খানা উইকেট হারাতে হয় যার ৮টি বালুর নামে যায়।সাউথ ওয়েলসের খেলায় ওয়ার্ডেন (৫/৫৮) আর এম সি সি এর সাথে সালামুদ্দিন (৫/১২৮) কিছুটা সাহায্য করেন বালুকে।বাকি খেলায় বালুকে কেউ সাহায্য করেনিনি।উল্টে এত ক্যাচ ফেলেছিল যে বালু অনায়াসে সফরে ১৫০ উইকেট পেতে পারতেন।এগুলো নাহলে সফরের ফল হয়ত অন্যরকম হত।(চলবে).........



টীকা.....
১।পাতিয়ালার মহারাজা ভুপিন্দর সিংএর অবদান ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক। খুব ভাল খেলোয়াড় না হলেও রঞ্জী ট্রফি তিনি দান করেন।না হলে ঐ ট্রফির নাম লর্ড উইলিংডন ও হতে পারত। তার ছেলে যাদবেন্দ্র সিং ভারতের হয়ে একটা টেস্ট খেলেন।
২।কেখাস্রু মানেকশা মিস্ত্রি পার্শি যুগের ক্রিকেটার। ১৮৯৩/৯৪ থেকে ১৯২৭/২৮ অবধি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন।কাঙ্গা,পাভ্রি,বাপাসোলা থেকে নাইডু, দেওধর অবধি সেতুর কাজ তিনি করেছেন।পারসি নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় ক্রিকেট কে মারাঠি মধ্যবিত্তের হাতে চলে যাওয়া তিনি দেখে যান।সেই আদি যুগের ভারতীয় ক্রিকেটে ১০টি অর্ধশতরান সহ ১৬০০ রান করেন ও ১০৪টি উইকেট পান।সেরা ৮/৭০, সর্বচ্চো ৯৫। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি মারা যান তখন বম্বে টানা ১৪ বার রঞ্জী জয়ের সুচনা করছে।
৩।হোরমাসজী দোরাবজী কাঙ্গা(১৮৮০-১৯৪৫).১৮৯৯/১৯০০ থেকে ১৯১১/১২ অবধি ৪৩টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ১৯০৫ রান করেন।সর্বচ্চো ২৩৩। তেমন বল না করলেও ৩৭ টা উইকেট আছে এবং সেরা বোলিং ৮/১৪।তার দাদার নামে বম্বে তে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয়। তার দুই ভাই ১৮৮৬ ও ১৮৮৮ সালে পার্শি দলের হয়ে ইংল্যান্ড সফর করেছেন।
৪।রুস্তমজি ফিরোজশা মেহেরহোমজী ১৭৭৭ রান করেছেন দুটি শতরান সহ।
৫।পালওয়াঙ্কার শিবরাম।বালুর ভাই। ১১৩০ রান করেছেন প্রথম শ্রেণির খেলায়।একটি শতরান।
৬। খান সালামুদ্দিন।জলন্ধরের ছেলে। মোট ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন প্রথম শ্রেণিতে। তার ভাইপো জাহাঙ্গির খান ভারতের হয়ে ১৯৩২ সালে প্রথম টেস্ট খেলেন। হ্যাঁ এই পরিবার থেকেই মজিদ খান, জাভেদ বারকি ও ইমরান খানের জন্ম।
৭।জাহাঙ্গির সোরাবজী ওয়ার্ডেন। প্রাক টেস্ট পর্বের ভারতের সেরা অল রাউন্ডার ১টি শতরান সহ ১২০৮ রান ১৮৩ টা উইকেট।
৮।বাঙ্গালোর জয়রাম। এই সফরে সুযোগ পান শুধু ইংল্যান্ডে খেলবার অভিজ্ঞতার জন্য। আরও জানতে পড়ুন অভিষেক মুখারজির ব্লগ......http://www.cricketcountry.com/articles/bangalore-jaya-ram-wg-graces-colleague-who-also-went-on-the-first-all-india-tour-to-england-278084
৯।শিবাজিরাও গায়কোয়ার। ইনি অংশুমান গায়কয়ারের বাবা দত্তাজিরাও এর ঠাকুরদা(গ্রান্ড আঙ্কেল)। ১৪ টি ম্যাচ খেলেন প্রথম শ্রেনিতে। খুব কম বয়সে মারা যান।
১০।মূলতঃ সমারসেট দলের খেলোয়াড় বাজানা (মানেকশা বাজানা) মারা যান লন্ডনে।৫৫ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ১৯০৫ রান করেন।
১১।মুল্লা মোটামুটি ব্যাটসম্যান ছিলেন।২৮ ম্যাচে তার রান মাত্র ৭৮১।
১২।পালওয়াঙ্কার বালু। অচ্ছুৎ শ্রেণির খেলোয়াড়। আরও জানতে পড়ুন রামচন্দ্র গুহর গ্রন্থ "আ কর্নার ফ্রম দ্য ফরেন ফিল্ড"... ভবিষ্যতে বালুকে নিয়ে আলাদা লেখার ইচ্ছে আছে।
১৩।আলিগড়ের ক্রিকেটার শফকৎ মাত্র ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলছিলেন।
১৪। সৈয়দ হুসেন (মোরাদাবাদ)ও মাত্র ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেন।
১৫।পর্তুগীজ ভারতের দমনে জন্মান বালসারা। ৩০ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় তার ১১৯টা উইকেট আছে।সেরা ৮/৩১।
১৬। মুকুন্দরাম দামদর পাই। ২২ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ৬৪০ রান করেন।
১৭।খিলভিদি শেষাচারি। জন্ম মাদ্রাজে। মৃত্যু কলকাতায়। ১৯টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ২০টা ক্যাচ এবং ১৬টা স্ট্যাম্প আছে। সত্যজিৎ রায়ের ধনদাদু মানে কুলদারঞ্জনের লেখায় এর বেশ প্রশংসা আছে।