Thursday, 5 May 2016

ভারতের প্রথম ইংল্যান্ড সফর (প্রথম পর্ব)

১৯১১ সালে ভারতীয় দল প্রথম ইংল্যান্ড সফরে যায়।ঠিক হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াতেও যাওয়া হবে কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।দলের নেতৃত্বে ছিলেন পাতিয়ালার মহারাজা [১]।দলের অন্যান্যরা ছিলেন কে এম মিস্ত্রী[২],কাঙ্গা[৩],মেহেরহোমজী[৪],শিবরাম[৫],সালামউদ্দিন[৬],ওয়ার্ডেন[৭],জয়রাম
[৮],গায়কোয়াড়[৯],বাজানা[১০],মুল্লা[১১],পি বালু[১২],শফকৎ[১৩],সৈয়দ হুসেন[১৪],বালসারা[১৫],পাই[১৬] এবং শেষাচারী[১৭]।  
        ভারতের বোলিং যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও ব্যাটিং খুবই দুর্বল ছিল।গোটা সফরে মোট ৪৩ টা ইনিংসে ৮বার ১০০ রান তুলতে ব্যর্থ হয়।এর মধ্যে ছ'বার প্রথম শ্রেণির ম্যাচে।আরও তিন বার তাঁরা ১০০ করতে পারেনি যদিও সেগুলি অসমাপ্ত ইনিংস ছিল।অন্ততঃ আরও ১৭ বার তারা ২০০ তুলতে পারেনি।অর্থাৎ গোটা সফরে ৬৫.১১% ক্ষেত্রে তারা ২০০ রান তুলতে ব্যর্থ হয়।ফলে প্রথম শ্রেণির ৯টি সহ মোট ১১টি ম্যাচে যা ছিল সফরের প্রথম ১১টি ম্যাচ, তাতে তারা একটানা হেরে যায়।এই প্রথম ১১টি ম্যাচে ইনিংস প্রতি তাদের গড় রান ছিল মাত্র ১৪২। কিন্তু পরবর্তী ১২টি খেলায় তারা ৬টি তে জেতে যার মধ্যে ২টি ছিল প্রথম শ্রেণির খেলা।বাকি ৪ টি তে হারে ও দুটি ড্র করে।গোটা সফরে ১৪ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় মাত্র দুটি খেলায় ভারত জিতেছিল। ১০টা খেলায় হেরেছিল ।প্রথম শ্রেণির নয় এমন খেলায় তার ৫ টি তে হেরেছিল।যদিও শেষ ১২টি ম্যাচে তাদের ইনিংস প্রতি গড় ছিল ২৩৪/৮। তিন বার ভারত ৪০০ রান করে এই দ্বিতীয় ভাগে। এবং একবারও ১০০ এর নিচে আউট হয় নি।প্রথম শ্রেণির ম্যাচ গুলিতে ১৬টি অর্ধশতরান ও ৪টি শতরান হয়েছিল ভারতের পক্ষে।গোটা সফরে অবশ্য ৯টি শতরান ও ২৮টি অর্ধশতরান হয়।এর মধ্যে কাঙ্গা,বাজানা,শিবরাম এবং মেহেরহোমজী প্রথম শ্রেণিতে শতরান করেন।অন্য খেলা গুলিতে মেহেরহোমজী দুটি, শিবরাম,ওয়ার্ডেন এবং সালামুদ্দিন একটি করে শতরান করেন।প্রথম শ্রেণির খেলায় ভারতের সর্বচ্চো রান ছিল ৪৮১।লিচেস্টার এর বিরুদ্ধে।সর্বনিম্ন ৭৬।ওয়ারউইকশায়ারের বিরুদ্ধে।প্রথম শ্রেণির ম্যাচ নয় এমন খেলায় ভারতের সর্বচ্চো রান ছিল ৪৬৩/৬।লিঙ্কনের বিরুদ্ধে। এবং সর্বনিম্ন ৫১। সফরের দ্বিতীয় ম্যাচে সাউথ ওয়েলসের বিরুদ্ধে।ব্যক্তিগত সর্বচ্চো রান কাঙ্গা। ১৬৩,প্রথম শ্রেণির খেলায় লিচেস্টার এর বিরুদ্ধে।
      সফরের প্রথম খেলায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কাছে ভারত হারে (এই একবার মাত্র...তারপর গত ১০৫ বছরে আর হারেনি)।পরের খেলায় সাউথ ওয়েলসের বোলার হেপারের (ম্যাচে ১২/৮১) বোলিং ভারত কে বিধ্বস্ত করে।এরপর কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির খেলায় লকহার্ট ম্যাচে ১০২ রানে ১০ উইকেট নেয়।আর দ্বিতীয় ইনিংস এ ফ্যালকন ৫/৫০। ইনিংসে হারল ভারত (যথারীতি ১০৫ বছরে এই একবার)।ইতিমধ্যে ভারত এম সি সি এর সাথে বেসরকারি টেস্ট (বলা যেতেই পারে) খেলেছে।এবং হেরেওছে। তাও আবার ইনিংসে। এম সি সির এই দলে মাত্র দুজন টেস্ট খেলোয়াড় ছিলেন। নেভিল টাফনেল আর জন হারনে।আর একজন জ্যাক হারনে ঐ বছরের শেষে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট খেলেন। এরা কেউই খুব বড় কিছু নন। যাই হোক এরপর ওয়ারউইকশায়ারের বিরুদ্ধে খেলায় ভারত আবর লাইন লাগায়(দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কোল্যাপ্স নিয়ে আলাদা গবেষণা হওয়া উচিৎ)।ফস্টার(৫/৩১) আর ফিল্ড(৫/৩০) ভারত কে প্রথম ইনিংসে ৭৬ রানে নামিয়ে দেয়।দ্বিতীয় ইনিংসে কেঁদে-ককিয়ে ১৮৫ রান তুলেছিল ভারত।তাও ক্রুফোর্ড ৩৬ রানে ৬ উইকেট নেয়।এরপর লাঙ্ক‍্যাশায়ারের বিরুদ্ধে কুড (৫/২২) ও হুডলেটন (৫/৩০)দের জন্য ভারত কোনও ইনিংসেই ১০০ করতে পারেনি(৮৫ ও ৯৪)।একই অবস্থা স্ট্র্যাফোর্ডশায়ারের বিরুদ্ধে (৭৪ ও ৫৭)। কারন মহান সিডনি বার্নস (ম্যাচে ২৯ রানে ১৪ টি উইকেট)।যদিও স্ট্র্যাফোর্ডশায়ার কোনও প্রথম শ্রেণির না মাইনর কাউন্টী দল। সারের বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংস ভাল খেললেও (২৬৪) দ্বিতীয় ইনিংসে আবার ধ্বস (১২০)। কারন হলেন সারের বার্ড (ম্যাচে ১০/৯৮)।কেন্টের ফেয়ারসার্ভিসকেও ভারত সামলাতে পারেনি(৫/৩৩)। এরপর নর্দাম্পটনশায়ার ও ইয়র্কশায়ারের কাছেও হারে ( ইয়র্কশায়ারকে অবশ্য ১৯৮৬ সাল অবধি হারান যায় নি......আর ঐ ১৯৮৬তেই শুধু...তারপর থেকে আজও "অধরা মাধুরী")।ইয়র্কের ড্রেক (৫/৫৫) ভাল বল করেন।
               এই ১১ টি খেলায় ভাল বল করেছিলেন একমাত্র বালু।বালু হয়ে উঠেছিলেন বিপক্ষের ত্রাস।স্টিকি ডগ উইকেটে তিনি ছিলেন ভয়ানক।তার বোলিং ছিল ভারতীয় দড়ির জাদুর মতই বিস্ময়কর। অক্সফোর্ডের বিরুদ্ধে ৫/৮৭,কেম্ব্রিজের বিরুদ্ধে ৮/১০৩(বালুর প্রথম শ্রেনিতে সেরা বোলিং),লাঙ্ক্যাশায়ারের বিরুদ্ধে ৭/৮৩,কেন্টের বিরুদ্ধে ৫/১০৯,নর্দাম্পটনের বিরুদ্ধে ৬/৫৮।শুধু বালুর জন্য স্ট্র্যাফোর্ডশায়ার কে ঐ ১৩২ রান তুলতে দু'ইনিংসে ১৫ খানা উইকেট হারাতে হয় যার ৮টি বালুর নামে যায়।সাউথ ওয়েলসের খেলায় ওয়ার্ডেন (৫/৫৮) আর এম সি সি এর সাথে সালামুদ্দিন (৫/১২৮) কিছুটা সাহায্য করেন বালুকে।বাকি খেলায় বালুকে কেউ সাহায্য করেনিনি।উল্টে এত ক্যাচ ফেলেছিল যে বালু অনায়াসে সফরে ১৫০ উইকেট পেতে পারতেন।এগুলো নাহলে সফরের ফল হয়ত অন্যরকম হত।(চলবে).........



টীকা.....
১।পাতিয়ালার মহারাজা ভুপিন্দর সিংএর অবদান ভারতীয় ক্রিকেটে অনেক। খুব ভাল খেলোয়াড় না হলেও রঞ্জী ট্রফি তিনি দান করেন।না হলে ঐ ট্রফির নাম লর্ড উইলিংডন ও হতে পারত। তার ছেলে যাদবেন্দ্র সিং ভারতের হয়ে একটা টেস্ট খেলেন।
২।কেখাস্রু মানেকশা মিস্ত্রি পার্শি যুগের ক্রিকেটার। ১৮৯৩/৯৪ থেকে ১৯২৭/২৮ অবধি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন।কাঙ্গা,পাভ্রি,বাপাসোলা থেকে নাইডু, দেওধর অবধি সেতুর কাজ তিনি করেছেন।পারসি নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় ক্রিকেট কে মারাঠি মধ্যবিত্তের হাতে চলে যাওয়া তিনি দেখে যান।সেই আদি যুগের ভারতীয় ক্রিকেটে ১০টি অর্ধশতরান সহ ১৬০০ রান করেন ও ১০৪টি উইকেট পান।সেরা ৮/৭০, সর্বচ্চো ৯৫। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি মারা যান তখন বম্বে টানা ১৪ বার রঞ্জী জয়ের সুচনা করছে।
৩।হোরমাসজী দোরাবজী কাঙ্গা(১৮৮০-১৯৪৫).১৮৯৯/১৯০০ থেকে ১৯১১/১২ অবধি ৪৩টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ১৯০৫ রান করেন।সর্বচ্চো ২৩৩। তেমন বল না করলেও ৩৭ টা উইকেট আছে এবং সেরা বোলিং ৮/১৪।তার দাদার নামে বম্বে তে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয়। তার দুই ভাই ১৮৮৬ ও ১৮৮৮ সালে পার্শি দলের হয়ে ইংল্যান্ড সফর করেছেন।
৪।রুস্তমজি ফিরোজশা মেহেরহোমজী ১৭৭৭ রান করেছেন দুটি শতরান সহ।
৫।পালওয়াঙ্কার শিবরাম।বালুর ভাই। ১১৩০ রান করেছেন প্রথম শ্রেণির খেলায়।একটি শতরান।
৬। খান সালামুদ্দিন।জলন্ধরের ছেলে। মোট ১৬টি ম্যাচ খেলেছেন প্রথম শ্রেণিতে। তার ভাইপো জাহাঙ্গির খান ভারতের হয়ে ১৯৩২ সালে প্রথম টেস্ট খেলেন। হ্যাঁ এই পরিবার থেকেই মজিদ খান, জাভেদ বারকি ও ইমরান খানের জন্ম।
৭।জাহাঙ্গির সোরাবজী ওয়ার্ডেন। প্রাক টেস্ট পর্বের ভারতের সেরা অল রাউন্ডার ১টি শতরান সহ ১২০৮ রান ১৮৩ টা উইকেট।
৮।বাঙ্গালোর জয়রাম। এই সফরে সুযোগ পান শুধু ইংল্যান্ডে খেলবার অভিজ্ঞতার জন্য। আরও জানতে পড়ুন অভিষেক মুখারজির ব্লগ......http://www.cricketcountry.com/articles/bangalore-jaya-ram-wg-graces-colleague-who-also-went-on-the-first-all-india-tour-to-england-278084
৯।শিবাজিরাও গায়কোয়ার। ইনি অংশুমান গায়কয়ারের বাবা দত্তাজিরাও এর ঠাকুরদা(গ্রান্ড আঙ্কেল)। ১৪ টি ম্যাচ খেলেন প্রথম শ্রেনিতে। খুব কম বয়সে মারা যান।
১০।মূলতঃ সমারসেট দলের খেলোয়াড় বাজানা (মানেকশা বাজানা) মারা যান লন্ডনে।৫৫ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ১৯০৫ রান করেন।
১১।মুল্লা মোটামুটি ব্যাটসম্যান ছিলেন।২৮ ম্যাচে তার রান মাত্র ৭৮১।
১২।পালওয়াঙ্কার বালু। অচ্ছুৎ শ্রেণির খেলোয়াড়। আরও জানতে পড়ুন রামচন্দ্র গুহর গ্রন্থ "আ কর্নার ফ্রম দ্য ফরেন ফিল্ড"... ভবিষ্যতে বালুকে নিয়ে আলাদা লেখার ইচ্ছে আছে।
১৩।আলিগড়ের ক্রিকেটার শফকৎ মাত্র ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলছিলেন।
১৪। সৈয়দ হুসেন (মোরাদাবাদ)ও মাত্র ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেন।
১৫।পর্তুগীজ ভারতের দমনে জন্মান বালসারা। ৩০ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় তার ১১৯টা উইকেট আছে।সেরা ৮/৩১।
১৬। মুকুন্দরাম দামদর পাই। ২২ টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ৬৪০ রান করেন।
১৭।খিলভিদি শেষাচারি। জন্ম মাদ্রাজে। মৃত্যু কলকাতায়। ১৯টি প্রথম শ্রেণির খেলায় ২০টা ক্যাচ এবং ১৬টা স্ট্যাম্প আছে। সত্যজিৎ রায়ের ধনদাদু মানে কুলদারঞ্জনের লেখায় এর বেশ প্রশংসা আছে। 

2 comments:

  1. দারুন। শ্রমলব্ধ ফসল। অনেক শুভেচ্ছা রইল।

    ReplyDelete